দুর্জন বিদ্ব্যান হলেও পরিত্যাজ্য (!!)

‘দুর্জন বিদ্ব্যান হলেও পরিত্যাজ্য’ ছোট বেলায় শেখা অনেকগুলো নীতি বাক্যের একটা । অন্য অনেক নীতি বাক্যের মতো এটারও কোন প্রয়োগ দেখা যায়না পরবর্তীকালে । যেমন ‘দূর্নীতি সকল উন্নতির অন্তরায়’ নামক ভাব-সম্প্রসারন যারা ভালোভাবে পড়ে পরীক্ষায় লিখে ভালো রেজাল্ট করে পরবর্তীতে সরকারী উচ্চ পদে আসীন হন তাদের অনেকেই দূর্নীতিতে সিদ্ধহস্ত হন। যেমন করে ‘লোভে পাপ, পাপে মৃত্যু’ পরবর্তীকালে হয়ে যায় ‘লোভে পাপ, পাপে পল্টি’ ।

একটা সমাজের সবচেয়ে জ্ঞানী-গুনী ব্যাক্তি কারা ? এমন প্রশ্নে প্রথমেই যাদের নাম আসবে তারা হলেন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকবৃন্দ । বিশ্ববিদ্যালয় যদি সর্বোচ্চ বিদ্যাপীঠ হয় তাহলে সর্বোচ্চ বিদ্ব্যান অবশ্যই সেখানে যারা পড়ান তারা । এখন সেই বিদ্ব্যানদের মধ্যে যদি গুটিকয়েক সংখ্যক দুর্জন থাকে তবে তাদের পরিত্যাগ করা হবে কিনা !!

বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক কর্তৃক ছাত্রী নিপীড়ন খুবই লজ্জাজনক ঘটনা । কয়েকজন দুর্জন শিক্ষকের জন্য পুরো শিক্ষক সমাজকে হেয় হতে হয় । সেই সাথে আমরা যারা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ি তাদেরকেও লজ্জায় পড়তে হয় । পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র-ছাত্রীদের সবাই অন্য চোখে দেখে, অনেকে তাদের সমীহ করে । আমরাও বুক ফুলিয়ে বলতে পারি যে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র। কিন্তু যৌন হয়রানির মতো খবরগুলো যখন পত্রিকায় আসে, লজ্জায় সবার মাথা হেট হয় ।

গত কয়েকদিন আগে ঢাবির থিয়েটার অ্যান্ড পারফরম্যান্স বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. সাইফুল ইসলামের বিরুদ্ধে এক ছাত্রীকে হয়রানী করার অভিযোগ করেন ঐ ছাত্রী এবং সেই সাথে প্রয়োজনীয় প্রমানাদিও জমা দেন ভিসি স্যার বরাবর । শিক্ষার্থীরা ঐ শিক্ষককে আজীবনের জন্য বহিষ্কারের দাবী জানালেও, প্রশাসন তাকে সাময়িক বহিষ্কার করে । আজাবীন বহিষ্কারের দাবীতে এখনো আন্দোলন চলছে । গত ২১ তারিখে দৈনিক ’ডেইলি সানে’ প্রকাশিত রিপোর্ট অনুযায়ী শুধু ঢাবিতে গত পাঁচ বছরে প্রায় ২০ জনের মতো শিক্ষক হয়রানীর দায়ে অভিযুক্ত হয়েছেন । দুঃখজনক হলো কারো বিরূদ্ধেই দৃষ্টান্তমূলক কোন ব্যবস্থা নেয়া হয় নাই ।

শুধু ঢাবি নয় অন্যান্য অনেক বিশ্ববিদ্যালয়েই এমন ঘটনা খবরে আসছে । এ বছরের মে মাসে জবির মার্কেটিং বিভাগের এক ছাত্রী বিভাগের এক শিক্ষকের বিরুদ্ধে সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যমে হয়রানি করার অভিযোগ তুলেন । অশালীন প্রস্তাবে রাজি না হওয়ায় ঐ ছাত্রীকে ক্লাসে দুর্ব্যবহার সহ পরীক্ষায় অংশগ্রহনে বাধা দেয়ার অভিযোগ করা হয় ।

এসব ঘটনায় অভিযোগকারীরা আন্দোলন করায় অভিযুক্তের বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে এমন নজির খুবই কম । বরং এর উল্টো ঘটনাও ঘটেছে । ২০০৮ সালে জাহাঙ্গীর নগরে নাটক ও নাট্যতত্ত বিভাগের তিন ছাত্রী বিভাগের এক শিক্ষকের বিরুদ্ধে যৌন হয়রানির অভিযোগ করে । বিচার না পেয়ে ২১ অক্টোবর, ২০০৮ অভিযুক্ত শিক্ষক বিশ্ববিদ্যালয়ে এলে ছাত্রছাত্রীর লাঞ্ছিত করেন। এই ঘটনায় ৬ শিক্ষার্থীকে বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বহিষ্কৃত হন । এই সিদ্ধান্তকে চ্যালেঞ্জ করে প্রফেসর সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী, সাংবাদিক কামাল লোহানী, আইন ও সালিশ কেন্দ্র এবং বহিষকৃৃত ছয়জন শিক্ষার্থী একত্রে একটি রিট আবেদন দাখিল করেন । পরে হাইকোর্ট এই সিদ্ধান্তকে অবৈধ ঘোষনা করে । এবং অভিযুক্ত শিক্ষককে সহযোগী অধ্যাপক থেকে সহকারী অধ্যাপক পদে পদাবনতি প্রদান করা হয় ।

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের যৌন হয়রানির ঘটনার পর যৌন নিপীড়নবিরোধী নীতিমালা প্রণয়নের নির্দেশ দিয়েছিলেন উচ্চ আদালত। আদালতের ওই নির্দেশের পর শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে নীতিমালা প্রণয়ন কমিটি গঠন করা হয়েছে। কিন্তু সেখানেই থেমে আছে উদ্যোগ। এখনো চূড়ান্ত নীতিমালা করেনি কোন বিশ্ববিদ্যালয় । এছাড়া বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন (ইউজিসি) ২০০৮ সালে যৌন নিপীড়নবিরোধী একটি খসড়া নীতিমালা প্রণয়ন করেছে। এরপর ৬ বছর কেটে গেলেও ফাইরগুলো এখনো লাল ফিতায় বন্দি, চূড়ান্ত হয়নি নীতিমালা ।

খসড়া নীতিমালায় সর্বোচ্চ শাস্তি হিসেবে শিক্ষকের চাকরিচ্যুতি এবং শিক্ষার্থীদের জন্য বহিষ্কারের বিধান রাখা হয়েছিল। কিন্তু এই নুন্যতম শাস্তিটা দিতেই অনেক প্রশাসন গড়িমসি করে যার ফলে প্রায়ই আমাদের এমন লজ্জাজনক খবর শুনতে হচ্ছে ।

কেউ যদি উদ্দেশ্যমূলোকভাবে কারো বিরুদ্ধে মিথ্যা অভিযোগ করে তার জন্যেও শাস্তির বিধান ছিল খসড়ায় ।

এই গুটিকয়েক শিক্ষক পুরো শিক্ষক সমাজকে রিপ্রেজেন্ট করে না । সামনে গেলে শ্রদ্ধায় মাথা নত হয় এমন শিক্ষকের সংখ্যা বেশী, একজন শিক্ষক শুধু শিক্ষক নন তিনি একজন পিতার মতো এমনটা ভাবার মতো শিক্ষকের সংখাই বেশী । হাতেগোনা কয়েকজন দুর্জনের জন্য সকল শিক্ষক, পুরো বিশ্ববিদ্যালয়ের বদনাম হউক আমরা কেউ তা চাই না ।

Advertisements

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s